বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১০

গীতগোভিন্দম - চন্দ্রবিন্দু স্টাইল

চন্দ্রবিন্দু র অনেক ফাজলামির মধ্যে এটা আমার তালিকাশীর্ষ দখল করে আছে অনেকদিন ধরেই। এমন রকবাজির গলাবাজি বহুদিন মিস্‌ করি!
:)


তোমাকে দেখাবো নায়াগ্রা তোমাকে শেখাবো ভায়াগ্রা
তোমাকে করবো আদর-আত্তি-যত্নম
ওগো ত্বমসি মম জীবনং, ত্বমসি মম ভূষণং
ত্বমসি মম ভব জলধি রত্নম।।
তোমাকে শোনাবো জয় গোঁসাই, তোমার বাবাকে মেসোমশাই
পুচ্ছে বেঁধেছি গুচ্ছ রজনীগন্ধা
আরে, আজি এ পরাণে রবির কর কেমনে জাগালো ডাইনোসর
হাউমাউ বেগে দেখি প্রিয়া মুখচন্দা!
দারুণ কাটলে ছোট্ট চুল, বোতাম আঁটতে করছো ভুল
সরু সংসারে কেমন ফুটিলে উদারা
স্মারগারলা খাণ্ডনাং ত্বম শিরসি মাণ্ডানাং
দেবী দেহিপদপল্লবমুদারম্‌।
তোমার জন্য চিন্তা হয়, তুমি তো প্রীতি জিন্টা নয়
টুপুর টাপুর কারিনা কাপুর চেষ্টা
তবু, তুমি আমার সিপিএম তুমি আমার এটিএম
তুমি আমার সিরিজ প্রেমের শেষটা।
খাচ্ছি কিন্তু গিলছি কই, পাখার রাজ্যে চুল শুকোই
টাকের মধ্যে পেরজাপতি ফড়ফড়িং
সোনা, বড্ড বেশি ঝলমলাও, লিফটে ওঠো একতলায়
বিটল্‌স ছাড়া অন্য পোকা খুব বোরিং!
তুমি শ্যামলা বঙ্গদেশ তুমি ইন্দো এসএমএস
তুমি অং বং ভব জলধি নুলিয়া
বধূ, চক্ষে এসো অন্ধ হোক, কক্ষে এসো নিন্দে হোক
বক্ষে এসো গীতগোবিন্দ ভুলিয়া।।

খারাপ মেয়ের খোঁজে

মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে একটা খারাপ মেয়ের গল্প লিখি।

কিন্তু বিষম একটা সমস্যায় পড়ে যাই। বারবারই।

খারাপ মেয়ে মানেটা যে কী, সেটা ঠিক ধরে উঠতে পারিনা।

ছোটবেলায় ব্যাপারগুলো অনেক সহজ ছিলো। এই যেমন ধরি, দুধ না খেলে খারাপ মেয়ে, চুল আঁচড়ে না বাঁধলে, দাঁত না মেজে দাঁতে পোকা হলে, ঝগড়াঝাঁটি করলে, পুতুল খেলায় খামচাখামচি করলে - এগুলোকে অনায়াসেই খারাপ মেয়ের বৈশিষ্ট্য বলে চালিয়ে দেয়া যেতো।

আরেকটু বড় হলে তো স্কুলে তীব্র ও তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যে হোমওয়ার্ক না করে আনলে, টিচারের কথা না শুনলে - অবধারিত তুমি খারাপ মেয়ে! আরো বড় গজকাঠি ছিলো বোধকরি শিষ্টাচার। এই এক বিষয় ছিলো স্কুলে, যাতে আমার বান্ধা ২৫ শে ২৫। সবসময়। আর পিটি। এটাতেও ২৫শে ২৫! বাসায় যতই দুষ্টুমি করে ফাটিয়ে ফেলিনা কেন, স্কুলে আমি বরাবরই শিষ্ট। সুত্রানুযায়ী, এখানে যারা কম নাম্বার পাচ্ছে তারা খারাপ মেয়ে। আমি ছিলাম সবচাইতে চঞ্চল, সবচেয়ে ছটফটে। ভীষণ দুরন্ত। তারপরেও কোন্‌ যাদুমন্ত্রবলে প্রতিবার ভালো মেয়ের খেতাব জুটে যেতো, বুঝতে পারতাম না। আমার মা'ও বোধ করি বুঝতেন না।

ক্লাসে ফার্স্ট হওয়াতে ইজ্জত মান কিছুটা বাঁচতো। নইলে বাবা-মা আমাকে "ভালো" মেয়ে সার্টিফিকেট দিতে যারপরনাই গাঁইগুই করতো, এটুকু জানি।


একটু বড় হতে হতে, দেখি সরে যাওয়া গোলপোস্টের মতো খারাপ মেয়ের সংজ্ঞাও পালটে যাচ্ছে।

যে মেয়েগুলো ডায়াস ফাটিয়ে চ্যাঁচায়, ওরাই দেখি সবচেয়ে ধারালো যুক্তি দেয় বিতর্কের সময়। ক্লাস পালানো প্রেম করা খারাপ মেয়েগুলো দারুণ ইন্টারেস্টিং আমার পানসে জীবনের পাশে। সুইসে আমি আম্মাকে নিয়ে যাই, বেলা আড়াইটা পর্যন্ত প্র্যাক্টিকাল করার পরে ভোঁ ভোঁ করছে মাথা আর পেটে ছুঁচোর কেত্তন - সে সময় অব্দি আমার একটা প্রেমও হয়নি। ন্যাকামি করছিনা, প্রমিস।

আমি মুখ নিচু করে সুইসের ভ্যানিলা পেস্ট্রিতে কামড় বসাই, আর পাশে প্রিতুর বয়ফ্রেন্ড লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ওর মুখের আধখাওয়া প্যাটিস চুমোর বদলে টান দিয়ে নিয়ে নিলো- মুখে মুখে এক মুহূর্ত ছোঁয়াছুঁয়ি হলো কি? ছিঃ! দেখতে নেই ওসব। খারাপ মেয়েরা করে।
আচ্ছা, এতো গ্যালো কিশোরী বয়সের কথা।
বড় হতে হতে অনেক পুরুষতান্ত্রিকতার চর্চাকে নিত্যসঙ্গী করে বেড়ে ওঠা। জানিতে বা অজানিতে, চেয়ে বা না চেয়ে অনেক পুরুষপ্রধান প্র্যাকটিসকে বাহবা দিতে শেখা। অথবা নিজের অজান্তেই সেগুলো সমাজ আর সংসারের চর্চায় একরকম সয়ে যাওয়া। বা সইয়ে নিতে শেখা।

তখন জানলাম, বুঝলাম ভালো মেয়েরা মুখ খারাপ করেনা, খিস্তি করেনা।

সিগারেট খায়না।

অতি অবশ্য অবশ্য সিগারেট খেলে তারা খারাপ মেয়ে।

এটা আমার কাছে শাঁখের করাতের মতো লাগতে লাগলো একসময়।

আমার খুব কাছের একটা মেয়েবন্ধু সিগারেট খায়, আমার সিগারেটের গন্ধে বিষম বমি পায়। যে কোনো কড়া গন্ধেই পায়। আজও পায়।

একদিক থেকে আমি সিগারেট খাওয়া সমর্থন করতে পারিনা, অন্যদিক থেকে প্রাণের বন্ধুর টান উপেক্ষাও করতে পারিনা। ও ছেলে বা মেয়ে যাই হোক, আমি প্রাণপণে ওর সিগারেট খাওয়ার আনন্দটুকু কেড়ে নিয়ে ওকে ভালো মেয়ে হবার পথে চালিত করতে রীতিমতো ব্যতিব্যস্ত করে তুললাম। ইংরেজিতে যেমন বলে, ইন্টেনশন ওয়াজ নোবল্‌, কিন্তু আমি ভুলে গেলাম ও বেচারীর বাড়ির কথা, কী ভীষণ একটা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো ও সে সময়। আরো ভুলে গেলাম, ওই দমবন্ধকর পরিবেশ আর পরিস্থিতিতে ওর একটুখানিক নিজস্বতা যা বেঁচে ছিলো, তা ওই সিগারেট খাওয়া বা আধময়লা জিন্স পরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ওর সিগারেট, আমার পালিয়ে লুকিয়েচুরিয়ে মডেলিং করার জন্য ছবি তোলা বা লেখালেখির মতোই একটা আউটলেট ছিলো। ভেন্টিলেটর।


এই ভেন্টিলেটর বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবার পর খারাপ মেয়ে নির্ধারণ করা আমার জন্য আরো কঠিন হয়ে গ্যালো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম তসলিমা নাসরীনের সব খারাপ মেয়ে বিষয়ক গল্পগুলোর সাথে হয় আমার নয় আমার চারপাশের বোন, বন্ধু, কাজিন, আন্টি সবার অনেক মিল! এমন কী যখন চেঁচিয়ে খারাপ মেয়ের কবিতা পড়ি, তখন বিষম একটা আনন্দ হয়।


একটা পর্যায়ে এসে শরীর বিষয়ক তুমুল ছুত্‌মার্গ দেখলাম।

নব্বই শতাংশ মেয়েদের ভেতর ধারণাটাই ধোঁয়াটে।

ছেলেদের ভেতর ভণ্ডামির পরিমাণ বেশি, ওপরের আবরণটা সরলে শরীরের ঔৎসুক্য বিষয়ে তাদের অবস্থান যাহা পাই তাহা খাই ধরনের।
মেয়েদের ধোঁয়াটে হবার কারণ দেখলাম মূলতঃ শুচিতার সংজ্ঞায় তাদের অপরিসীম আস্থা, আর শরীর একটা সম্পদ বা অস্ত্র যাই বলিনা কেন, এই চিন্তাটা মাথার ভেতরে খুব ছোটবেলা থেকে গেঁড়ে বসা। খুব দোষ যে দেওয়া যায় তাদের তা নয়, কিন্তু শরীরী এই অন্ধত্ব, শুধু শরীরী থাকেনা (থাকা সম্ভবও নয় বোধ করি বাংলাদেশের তীব্র পুরুষিক সমাজের ততোধিক পুরুষিক আচরণের জন্য), মানসিক অর্গল হয়ে যখন শারীরিক সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের বিকাশকেও রদ করে, তখন আমি আবারও হোঁচট খাই।

শরীর দিয়ে সুখ খুঁজতে যাওয়া নারী আর পুরুষের স্তরায়নে এত তফাত। এতো বেশি ডিস্প্যারিটি! তখন খারাপ মেয়ে হিসেবে যেই মেয়েগুলোকে দেখতাম, বা লেবেলিং করা হতো, আজ প্রায় দশ বছর একটা অন্য সমাজে থেকে, সেই সমাজের ভেতরের রূপটাকে আগাপাশতলা দেখে সেই লেবেলিংকে বড় অর্থহীন মনে হয়। শরীরের সুখ যে টাকাপয়সা বড়িগাড়ির মতই সুখ এবং তার অণ্বেষণ যে অন্য সব এষণার মতোই বাঞ্ছনীয়, এটা বুঝতে বা মেনে নিতে আমারও সময় লেগেছে। একটা রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে আপাতঃ অনতিক্রম্য সেই ট্যাবুকে পার হতে হয়েছে। কিন্তু একবার সেটা পার হবার পর দেখি খারাপ মেয়ে খুঁজে পাওয়া বড়ই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

একসময় য়্যুনিভার্সিটিতে স্কার্ট পরাটা খারাপের সংজ্ঞা ছিলো, কখনো পা দেখানোটা। এখন অফিসে এন্তার স্কার্ট পরি, পা সবসময়ই দেখাই। কালো মানুষদের বদলে সাদা মানুষরা দ্যাখে, এই যা! নাইনে ওঠার পর জোবার সাইকেলটা নিয়ে পাড়া দাপানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, সেদিন আমার পার্টনার বললো দূরের সাবার্বে বাড়ি কিনলে ছায়াঢাকা পাখিডাকা পার্কের ভেতর দিয়ে আমরা বাইক চালিয়ে আসবো, আবার শিখতে হবে সাইকেলের অ আ ক খ। চম্‌কে উঠে দেখি, আবারও গোলপোস্ট সরে গেছে।
ভালো কিংবা খারাপ মেয়ের বিভাজক রেখা বেঁচে নেই আর মাথার ভেতর।
খচখচানিটা বেঁচে আছে।

আর তুমুলভাবে বেঁচে আছে যোনি আর শিশ্নের রাজনীতি।

শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০১০

বিস্রস্ত জার্নাল-৩

(এই কয়েকটা লেখা সচলায়তনে লুকনোই ছিলো বলা যায়। নিজের ব্যক্তিকথন নিজের কাছেই থাকুক,এ জন্য এখানে পোস্ট করলাম)

দিন গুলো বয়ে চলে টানাহ্যাঁচড়ায়, কখনো গড়িয়ে, কখনো হেসে-কেঁদে, ভীষণ খারাপ লাগা সিগারাটের ছাই নিষ্কলুষ কার্পেটের ওপর "হ্যাক থু" করে (পলমল স্লিম কাট কিন্তু, তুই বেশি বেশি খাসনি, পুরুষ মানুষের অত মেয়েদের সিগারেট খেলে চলে? পুরুষত্ব কমে যেতে পারে, যদিও আমার নিরীশ্বরের নামে দিব্যি দিয়ে বলতে পারি পুরো সিগারেট ব্যাপারটার মধ্যেই আমি পুরুষ পুরুষ থেকে পুরীষ পুরীষ ভাবটাই বেশি পাই, তাপ্পরও নিয়ম ভাঙা বলে কথা, সেটা মাস উদ্ যাপনে একবার না করলে তাই বা কেমন দেখায় বল্), মদটাও ভালো জাতের শার্ডোনে হোলোনা, জ্যামিসনস রান আনতে বলেছিলাম কিন্তু শেষমেষ পাওয়া গিয়েছিলো রোসমাউন্ট রিসলিং ,বৃষ্টির দিন মাথায় করে কষকষে করে বাঙালি ভঙ্গীতে রাঁধা স্যামন মাছের সঙ্গে তাই সই, বিশেষতঃ ঝড়জল মাথায় করে সেটা আনা হোলো, সেটার একটা মাধুর্য তো চুমুকের ভেতরেই থাকবে। কবে যেন, সেই দূরদেশে, যেখানে থাকতুম, একবার কোন্ এক হতচ্ছাড়া কোমল পানীয়ের বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম, চুমুকে চুমুকে তৃপ্তি, আমার পাশে বসা ফক্কড় ছোকরা ফট্করে বলে বসলো, আচ্ছা ওটার ক গুলোকে বদলে সব ত করে দিলে ব্যাপারটা বেশ হয় তাইনা? এত্ত জোরে হেসে উঠেছিলাম পাশের চুম্বন অভিলাষী সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তো বটেই মায় রিকশাওয়ালা পর্যন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে নিরীক্ষণ করে আপাদমস্তক, আহ্ , বড় বেশী মনে পড়ে আজ বাদলার দিনে সেই দমকা হাওয়ার মতো ঝোড়ো হাসিটাকে। কতদিন প্রাণ খুলে হাসিনা, প্রাণ খুলে গান গাইনা। হাসির বদলে আজো কান্নাই গান হয়, তারপরেও তো মনে হয় , ভালোলাগা, ভালো দিন আবার হয়তো আসবে, মুক্তির পথ কি সাকার কি নিরাকার কোনো ধর্ম বা অধর্মবাদীই মালুম করে বলতে পারেনি আজ অবধি তাও আশায় বুক বেঁধে গলা ছাড়ি - অভয় মনে কণ্ঠ ছাড়ি, গান গেয়ে তুই দিবি পাড়ি , খুশি হয়ে ঝড়ের হাওয়ায় ঢেউ যে তোরে খেতেই হবে --


কিন্তু মুক্তি তোরে পেতেই হবে এমন দিব্যি তো কেউ দেয়নি, তারপরও মুক্তি পাবার তৃষ্ণা মেটেনা কেন আমার????

বিস্রস্ত জার্নাল-২

(এই কয়েকটা লেখা সচলায়তনে লুকনোই ছিলো বলা যায়। নিজের ব্যক্তিকথন নিজের কাছেই থাকুক,এ জন্য এখানে পোস্ট করলাম)

অ্যাঞ্জেলা'স অ্যাশেস এর লেখক মারা গ্যাছেন। খবরটা শুনে আজ কেমন যেন একটা শূন্য অনুভূতি হলো ভেতরে। আমার কেবল ওই বাচ্চাটার ছবি চোখে বারবার ভেসে ওঠে আর খুব একটা মমতায় ভেতরটা ভরে যায়। ছবিটা দেখিনি, কিন্তু এই বইটা আমার জীবনে যে কী ভীষণ প্রভাব ফেলেছে, আমাকে মানুষ হিসেবে অনেকটাই অন্যরকম করে দিয়েছে, সেটা না বললেই নয়। বেঁচে থাকা যেহেতু অর্থহীন একটা রিচুয়ালে পরিণত হচ্ছে, মারা যাওয়াটাও সেরকম নৈর্ব্যাক্তিকভাবে দেখতে পারলে মন্দ হতোনা, কিন্তু কোনো একভাবে সেই নির্লিপ্তি এখনও অর্জন করে উঠতে পরিনি। সেটা ভালো কি খারাপ তা বিতর্কসাপেক্ষ, আমার পুরো বেঁচে থাকাটাই ভালো বা খারাপ এর তালিকায় ফেলে দিতে পারলে একরকম বেঁচে যেতাম, অথবা ওই বোধিপ্রাপ্ত নির্লিপ্তিও হয়তো কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ দিতো। তাই কয়েকটা মৃত্যুর সাথে আমার সংযোগ,আমার সংসর্গ আমাকে কিছুটা ভাবায়। হেনাদাস আন্টি মারা গ্যাছেন। ছোটবেলায় ঊর্মির আম্মা যখনই মহিলা পরিষদের মিটিংয়ে আসতেন ঊর্মির অবধারিত দ্বিতীয় ঠিকানা ছিলো আমাদের বাড়ি। আয়শা খানম আন্টির সাথেই হেনা আন্টিকে প্রথম দেখা। সত্যি বলতে কি, আমার প্রথম দর্শনে মহিলাকে ভালো লাগেনি। আরো অনেক কিছুর আগে হয়তো আমার যা ইন্সটিংক্ট, তাতে রুক্ষ, চশমা চোখের ওই নারীকে আমার আর সবক'টা "নারীবাদী"র মতোই ক্লিশে লাগতে শুরু করেছিলো। আরও একটা বিতৃষ্ণার কারণ বোধ করি ছিলো মহিলা পরিষদের উঁকিঝুঁকি মারা মিটিংগুলোতে একেবারেই মেয়েলি কুটনামি আর কূটকচালির একটা আধিক্য বা প্রাবল্য দেখতে পাওয়াটা। হেনা আন্টির সাথে প্রথম মিষ্টতার সূচক কিন্তু একটা ঝাল খাবার দিয়ে। মহিলা পরিষদের মেয়েরা, মানে আশ্রিত মেয়েরা ওখানে দারুণ সব সিঙ্গাড়া আর চপ আর পুরি তৈরি করতো। বারো কি তের বছরের বুদ্ধি ওদের দুর্দশায় কাতর হবার থেকে সিঙ্গাড়ার মৌ মৌ গন্ধে যে অনেক বেশি উদ্বেলিত হবে তাতে আর সন্দেহ কি! হেনা আন্টি এরকমই কোনো একটা মিটিংয়ে আমাকে সিঙ্গাড়ার আর তাঁরও ভক্ত বানিয়ে ফেলেন। তারপর ওখানে মেয়েদের দিয়ে জামা বানাতে দেয়া, ঊর্মি আর আমার পেয়ারা গাছে উঠে লাফানো--সব মনে আছে। আমি নেচেছিলাম একবার ওদের একটা বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে। আমার নাচ দেখে বোধ করি ডলি জহুর- তখন নাটক করতেন না কি' যেন- তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন এইসব দিন রাত্রি করে -- জোবার খাড়া নাক আর আমার সুন্দর চেহারা এই দুই নিয়ে অনেক মজার মজার ঠাট্টা করতে করতে হেনা আন্টি আবারও অনেক অনেক মিষ্টি আর সেই চপ না সিঙ্গাড়া কি যেন মুখে তুলে তুলে খাইয়ে দিচ্ছিলেন আমাদের। এখনও মনে আছে। কি করে যেন মগজের ভেতর থেকে অনেক স্মৃতি টুক করে ইরেজার দিয়ে ঘষে কেউ মুছে ফেললেও এই আদরের টুকরো স্মৃতিগুলো এখনও রয়ে যায়। নির্লিপ্তি তাহলে কি শুধুই একটা দশা? তাও কিছুদিন বা কিছুকালের জন্য? কে জানে!


তাও এতদিন পর কেমন যেন একটা শূন্যতা বোধ করছি ভেতরে। সেটা কি হেনা আন্টির মৃত্যু না'কি তাঁর সাথে আমার টুকরো স্মৃতির সহবাস -- সেটা বুঝতে পারছিনা। পুরনো মানুষগুলো চলে গ্যালে এরকম ফাঁকা লাগে, অনেক দূরদেশে, ওই বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে বসেও লাগে। জড়ভরত একটা জীবন, জরদ্গ ব একটা ভবিষ্যত আর অসীম একটা অনিশ্চয়তার মাঝেও মৃত্যু বড় নাড়ায় মাঝে মাঝে।


ভালো থাকুন হেনা আন্টি।


ভালো থাকুন।

বিস্রস্ত জার্নাল

দিনগুলো এমন স্থবির হয়ে আছে যে টেরই পাচ্ছিনা বেঁচে আছি কি মরে গেছি। কেমন যেন - ক্লান্তিকর,অসহায়,নির্লিপ্ত বেঁচে থাকা। একে বেঁচে থাকা বলে কি'না জানিনা। দিন কেটে যায়, ক্যলেন্ডারের পাতা উল্টোয়,মাঝে মাঝে ভেতর থেকে কিছু একটা -- জানিনা কি ঠিক-- সুপ্ত বমনেচ্ছা না'কি তীব্র বিতৃষ্ণা --- একটা কিছু তো অবশ্যই-- তীব্র হলাহলের মতো বের হয়ে আসতে চায়--- তারপর পেটের ভেতরই পাক খেয়ে আবারও কোথায় যেন,উল্টে পড়ে যায়। এই অর্থহীন, সময়হীন,দৈনন্দিন,একঘেয়ে,দশ বাই বারো ফুটের ঘরে সকাল দুপুর সন্ধ্যে রাত সব বয়ে চলে। রক্তকফমলমুত্রবিষ্ঠাথুথুবীর্যবর্জ্য সকল রকম স্খলন হতেই থাকে,হতেই থাকে,হতেই থাকে। বুকের ভেতর, খুব গভীরে কোথাও--- আরেকটা স্খলন হয়,আমি শুনতে পাই। কিন্তু আমি জানিনা,সেই স্খলন বহিরঙ্গের নির্লিপ্তি পরিয়ে অন্তরঙ্গে অলোড়ন তুলতে পারার মত জোরালো কি'না। কখনও কখনও শুধু ছোট একটা বুদবুদের বুড়বুড়ি কাটার মতো শব্দ শুনতে পাই ভেতরে,চোখ ফেটে কান্না আসতে চায়,ব্যাস্ ওটুকুই। কান্নাটা কেন যেন আর আসেনা। দম আটকে আসি আসি করেও দমটা আটকায় না। কেন এই অসহনীয় নির্লিপ্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি সেটাও জানিনা,এর শেষ কবে --- তাও না। মাথার মধ্যে তবুও কে যে নিরন্তর বলে চলে - লুক্টর এট এমার্গো --- লুক্টর এট এমার্গো -------------

জীবন, ভালো আছো?

Life is what happens to you
While you're busy making other plans

এ কথাটা বহুবার শোনা,বহুবার বহুভাবে আনমনে ভাবা,তারপরও কেন জানিনা,আজ অনেকদিন পর জন লেননের এ কথাগুলোকে বড় অসময়ে সত্যি বলে মনে হচ্ছে। জীবন কতটা কঠিন,কতটা জটিল,কতটা পথ পেরিয়ে তবেই জীবনকে পাওয়া যায়,বোঝা যায় - এ সমস্ত কূটতর্ক দূরে রেখেও বলা যায়,এই যে রাত্তির একটায় আমার নির্ঘুম চোখ,আর পেটের খিদেতে যতটা নয়,চোখের আর মনের খিদেতে তার চেয়েও অনেক বেশি ঝালটক চানাচুর চিবোনো,মাঝেসাঝে নোনতা বিস্কুটে কুটুস কাটুস কামড় এই আপাতঃ সুখের বিভ্রম,আসলে সুখ নয় জেনেও সুখ ভাবা,এটাই জীবন।

তার মঝে হুউউশশ্‌ করে ছুটে চলা স্বপ্নচিন্তা,জুম জুম জুম গাঢ় লাল রঙের মাজদা থ্রি অথবা ভি-সিক্স,ছোট্ট উঠোনওয়ালা বাড়িতে বসে বিকেলের চায়ের সাথে রঙধনু দেখবার শখ,গল্প লেখার জন্য মাঝেসঝেই কোমর বেঁধে নামবার প্ল্যান,প্রাণীজ আমিষ পুরোপুরি বাদ দেবার চিন্তাভাবনা,ভালো একটু টাকাপয়সা জমিয়ে পৃথিবীটা ঘুরে দেখবার স্বপ্ন - শেষ পর্যন্ত স্বপ্নই। এর মাঝে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ঘটনা,হঠাৎ করেই পিচ্চিবেলার মতো আঁকিবুকি করা সুন্দর একটা কার্ড পাওয়া- সেই সুদূর ক্যানাডা থেকে কত মনে করে পাঠিয়েছে বোনটা- অথবা নিঝুম রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পসামের কর্কশ খ্যাসখ্যাস আওয়াজ জানালার পাশে-এটাই আমার জীবন। আমার জীবনে অতটা রঙ নেই যতটা স্বপ্নে আছে,অতটা উচ্ছ্বাস নেই,যতটা স্বপ্নে দেখি। মাঝে মাঝে এই বর্ণহীন নিরুত্তাপ জগৎ থেকে খুব পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
খুব।
সাধ হয় হিন্দি সিরিয়ালগুলোর মত ভীষণ ঝাঁ চকচকে একটা বাড়িতে থাকি। চাকরবাকরপাইকপেয়াদাখানসামাবরকন্দাজ সব থাকুক। খুব সুন্দর শাড়ি-কাপড় গয়নাগাটি পরে ঘুরে বেড়াবো। জীবনের একমাত্র সমস্যা হবে কোন রঙের জামার সাথে কোন্‌ নেইলপলিশটা ম্যাচ হবে। আজ কি ফুচকা খেতে যাবো না'কি কেএফসি'র চিকেন? মাঝে মাঝে একটু গম্ভীর জিনিস নিয়েও ভাববো। কিন্তু সেগুলোর দৌড় হবে শাশুড়ি হলে তাকে মা,আম্মা না মামণি বলবো অব্দি। বরের অথবা বয়ফ্রেন্ডের সাথে অর্থহীন কথার প্যাঁচ কষবো,কোনো আপাতঃ কারণ ছাড়াই অতিমানবীয় একটা টেনশন তৈরি হবে,আবার খুব তুচ্ছ ও ফালতু কারণে সেটা ঠিকও হয়ে যাবে। টাকাপয়সা কোনো সমস্যাই হবেনা,কক্ষনো না। কারণ হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকাদের জীবনে টাকা জিনিসটার যে একটা মূল্য আছে,তা কস্মিনকালেও মনে হয়না। আবার মনে হয় অফিসে কাজ করবো,বাই ডিফল্ট অবশ্যই বস বা বসের খুব কাছের কোনো মানুষ হবো। চাই কি অধঃস্তনদের ওপর যেকোনো সুবিধে নেবো,যখনতখন যা ইচ্ছে আবদার করবো,একদম মামাবড়ির মতই আহ্লাদে ন্যাকামিতে গলে গলে পড়বো। বিশেষতঃ সুন্দরী মেইকআপ দেওয়া ইম্যাকুলেট লুক মেইনটেইন করলে তো আরো পোয়াবারো। জীবনে সত্যিকারের কোনো সমস্যা থাকবেনা,যেগুলো থাকবে সেগুলো সবই প্লাস্টিক সমস্যা হবে। জীবনটাও প্লাস্টিক জীবন হবে। স্টেপফোর্ড ওয়াইভস এর মতো বরও খুশ্‌ আমিও খুশ্‌!

কিন্তু নিজের জীবনটাকে যতই দেখি,বুঝতে পারি সে বেচারা বড়ই ইকো ফ্রেন্ডলি। প্লাস্টিক জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের শত তরিকা জানা থাকার পরও ভীষণই মাটির কাছে তার বাস। মাটির সানকি,কলস ঠোকর খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যে কান্নাটা কাঁদে,প্লাস্টিক কাপ-গ্লাসের ঠোঁট বাঁকানো হাসি তাকে অবজ্ঞাই করে যায় শুধু। বেচারা আমার জীবনটার আর কসমোপলিটান হওয়া হয়ে ওঠেনা। জীবন মানে এককালে জানতাম আনন্দ আর খুশি আর একটু বড় হবার পর জেনেছিলাম উত্তেজনা শিহরণ প্রতিযোগিতায় জিতে যাওয়া আর নিজের বিশ্বাসের জন্য লড়াই করে যাওয়া। আজ,একটুও বুড়িয়ে না গিয়েও(থ্যাংকস টু রবিরুড়ো)সেই আনন্দটাকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি। আজকাল মাঝেমধ্যেই মনে হয় শুধু নিরন্তর বয়ে চলাও জীবন। কিচ্ছু নেই।
টানাপোড়েন নেই, উত্তেজনা নেই।
ঝগড়া নেই,তক্কোবিতক্কো চলছে না। সুখের আতিশয্য নেই। সবচাইতে ভয়ের কথা হলো দুঃখের তীব্রতাও ম্রিয়মান।
জীবন শুধু একঘেয়ে দিনযাপনের গ্লানিতে পরিণত হয়েছে। হচ্ছে।
অনেকদিন আগে রুমি ভাইয়ের সাথে একটা আলাপে উনি বলেছিলেন যে সত্যিকারের দুঃখ না পেলে নাকি মানুষ হওয়া যায়না। ভালো মানুষ হতে হলে অনেক দুঃখ পেরিয়ে তবেই হতে হয়। বড্ড জানতে ইচ্ছে করে রুমি ভাই,ওই ভালো মানুষ হবার পাট চুকলে,তারপর কি? দুঃখ বেদনা জ্বালা যন্ত্রণা সব চুকবার পর কী? যদি তারপরে বেঁচেবর্তে থাকতে হয়, জীবনের মানে যখন ফুরায়ে যায়,তখন?

তখন কি এই ধূলিমলিন বহুচর্চিত অবিন্যস্ত জীবনকে হাতের মুঠোর ওমে পুরে নিয়ে বলতে হয়,"ভালো আছো তো সোনা?"